জানেন কি, ঢাকা মোট কতবার রাজধানী হয়েছে?

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা ঢাকা কেবল একটি শহর নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রায় চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই শহর ক্ষমতার পালাবদল, সাম্রাজ্য বিস্তার, ঔপনিবেশিক শাসন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। একটি নদীতীরবর্তী জনপদ থেকে আজকের বিশ্বমানের মেগাসিটিতে পরিণত হওয়ার পথে ঢাকা মোট পাঁচবার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করেছে—যা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

নিচে ধারাবাহিকভাবে ঢাকার রাজধানী হওয়ার ইতিহাস তুলে ধরা হলো।

১. ১৬১০: মুঘল আমলে ‘জাহাঙ্গীরনগর’—প্রথম রাজধানী

ঢাকার রাজধানী হওয়ার ইতিহাস শুরু হয় ১৬১০ সালে, যখন মুঘল সুবেদার ইসলাম খান চিশতী বাংলার প্রশাসনিক রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। সে সময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধ, আরাকান ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ এবং পূর্বাঞ্চলে প্রশাসনিক দুর্বলতা মুঘলদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। সামরিক ও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ইসলাম খান ঢাকাকে উপযুক্ত মনে করেন।

মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সম্মানে শহরের নামকরণ করা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর’। এ সময় ঢাকায় দুর্গ, প্রশাসনিক ভবন, মসজিদ, সড়ক ও বাজার নির্মাণ শুরু হয়। নদীপথে যোগাযোগের সুবিধার কারণে শহরটি দ্রুতই বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। মসলিন শিল্প, নৌবাণিজ্য এবং কারুশিল্পের জন্য ঢাকা আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করতে শুরু করে।

২. ১৬৬০: মীর জুমলার সময় দ্বিতীয়বার রাজধানী

১৬৩৯ সালে শাহ সুজা বাংলার সুবেদার হলে রাজধানী আবার রাজমহলে স্থানান্তরিত হয়, ফলে ঢাকা সাময়িকভাবে তার গুরুত্ব হারায়। তবে ১৬৬০ সালে সুবেদার মীর জুমলা পুনরায় ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করেন। পরবর্তী সুবেদার শায়েস্তা খানের আমলে (১৬৬৪–১৬৮৮) ঢাকা তার স্বর্ণযুগে পৌঁছে।

এই সময় ঢাকার জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এটি বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। মসলিন কাপড় ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি হতো। লালবাগ কেল্লা, সাতগম্বুজ মসজিদসহ বহু ঐতিহাসিক স্থাপত্য এই সময় নির্মিত হয়। ১৭১৭ সালে মুর্শিদকুলী খান রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে ঢাকার দ্বিতীয় রাজধানী অধ্যায় শেষ হয়।

৩. ১৯০৫: বঙ্গভঙ্গের পর তৃতীয়বার রাজধানী

মুঘল আমলের প্রায় দুই শতাব্দী পরে ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকা আবার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলা প্রদেশকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়—পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গ ও আসাম। নবগঠিত এই প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকাকে।

এই সময় ঢাকার আধুনিক নগরায়ণের ভিত্তি তৈরি হয়। কার্জন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পরিকল্পনা, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ এবং নতুন সড়ক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। যদিও ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ঢাকার এই রাজধানীর মর্যাদা মাত্র ছয় বছর স্থায়ী হয়, তবুও এই সময়ের উন্নয়ন ভবিষ্যতের ঢাকা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৪. ১৯৪৭: পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, যার দুটি ভৌগোলিক অংশ ছিল—পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)। ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয় এবং এটি ঢাকার চতুর্থবার রাজধানী হওয়ার ঘটনা।

এই সময় ঢাকায় প্রশাসনিক অবকাঠামো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও আবাসিক এলাকা দ্রুত প্রসার লাভ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানসহ বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই শহর। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ঢাকাকেই আন্তর্জাতিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

৫. ১৯৭১: স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী

ঢাকার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয় ১৯৭১ সালে। দীর্ঘ সংগ্রাম ও নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ঢাকা পঞ্চমবারের মতো রাজধানী হয়—এবার একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের রাজধানী হিসেবে।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর বিজয়ের মাধ্যমে ঢাকা শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, বরং স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মহানগরে পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর ইতিহাসে ঢাকার বিশেষত্ব

১৬১০ সালের একটি ছোট প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে আজকের ব্যস্ত মহানগর—ঢাকার এই দীর্ঘ যাত্রাপথের প্রতিটি অধ্যায়ে রাজধানী হওয়ার ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক কৌশল, ব্রিটিশদের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার লাল-সবুজ ইতিহাস—সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা এক অনন্য ঐতিহাসিক শহর।

আজকের ঢাকা কেবল বাংলাদেশের রাজধানী নয়; এটি বহু শতাব্দীর রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার জীবন্ত দলিল—এক শহর, যা ইতিহাসের বহু যুগকে নিজের ভেতরে ধারণ করে আছে।

Leave a Comment